অনলাইন ডেস্ক : ইস্টকোস্ট গ্রুপ, বিএম এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স, যমুনা স্পেসটেক জেভি লিমিটেডসহ কয়েকটি গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারকারীরা। কোনো সরকারই তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারও উদার হস্তে তাদের সব সুবিধা নিশ্চিত করে যাচ্ছে। নানা সুবিধা দিয়েও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ সরকারগুলো। অতীতে যখনই দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে তখনই নানান কারসাজি করেছে। এবারও অক্টোবর মাসে দাম বাড়ার আভাস পেয়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কয়েকদিন ধরেই এলপিজির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫৮৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় ২ হাজার টাকার বেশি দামে বেচাকেনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারকরা। আর ২৫ সেপ্টেম্বরের পর পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ঘোড়াশালে ওমেরা এলপিজির ডিপোতে আমার ট্রাক গিয়ে ৭ দিন ধরে বসে আছে গ্যাস দিচ্ছে না। আমার মতো আরও শতশত ট্রাক লাইন দিয়ে বসে আছে।
বেশি দামে বিক্রি প্রসঙ্গে বলেন, বিইআরসি সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৫৮৫ টাকা। অথচ ১৬৫০ টাকা দিয়ে আমাকেই কিনতে হয়েছে। এরপর রয়েছে অন্যান্য খরচ, আর একটি ট্রাক গিয়ে বসে রয়েছে তার ভাড়া কোথায় থেকে আসবে।
বাড়তি দামের বিক্রির বিষয়টি অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি সিরাজুল মওলা বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, ওনারা (আমদানিকারক) বলতেছে বিইআরসি ঘোষিত দামে তারা কিনতে পারেনি। এখন মাল (এলপিজি) নিলেও অক্টোবর মাসে যে দাম ঘোষণা করবে সেই দামে দিতে হবে। আমরা মাল তুলবো কি করে। অক্টোবর মাসে দর ঘোষণা এলেই দেখবেন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এর একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, অক্টোবরে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য ওমেরা, যমুনা, বিএম এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজি ধরে রেখেছে যে কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের ডিপোগুলো পরিদর্শন করলেই বিষয়টি ধরা সম্ভব, প্রশাসন সেই কাজটি করে না কেনো।
লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, এলপিজির আমদানি পর্যায়ে কোনো ঘাটতি নেই। আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, আর সেপ্টেম্বর মাসে এসেছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি করেন বা নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত করেন, তবে তা প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
অক্টোবরে টন প্রতি ৬৪ ডলারের মতো দাম বেড়েছে, সে কারণে বাড়তি মুনাফা করতে ভোক্তাদের জিম্মি করা হচ্ছে। সরকার কঠোর না হলে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
আমদানিকারকরা বেশি দামে বিক্রি করার বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বলেন, কোন কোম্পানি যদি অনিয়ম করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।
৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পরে এলপিজি আমদানির চালকের আসন থেকে সরে যায় বেক্সিমো, ওরিয়ন, বসুন্ধরাসহ কয়েকটি কোম্পানি। সেই জায়গা দখল করে নেয় আজম জে চৌধুরীর ইস্টকোস্ট গ্রুপ, হাসান মাহমুদ রাজার কোম্পানি ইউনাইটেড গ্রুপ, এনার্জি প্যাক, যমুনা স্পেসটেক এলপিজি, বিএম এলপিজিসহ হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি।
বিইআরসির একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, এক সময়ে ১৯০০ টাকার এলপিজি অনেক কম দামে বিক্রি করছিল ইউনাইটেড গ্রুপ। অন্যরা তখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছিল আমাদের কাছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তাদের চাপেই ১০৮ ডলারের জাহাজ ভাড়া ২৫০ ডলার করতে হয়েছিল। যদিও ১০৮ ডলারেই অনেক বেশি ছিল তখন। এখানে সরকারকেও বিভ্রান্ত করে তারা। একবার এসে বললেন, জাহাজ ভাড়া না বাড়ালে তারা গ্যাস আনবে না। আমরা বললাম, আপনারা নিয়ে আসেন, এনভোয়েজ দাখিল করেন, দাম বাড়ানো হবে। তারা সেই কথা না শুনে মন্ত্রণালয়ে গেলেন। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো, সরবরাহ নিশ্চিত করতে যা করা দরকার করতে হবে। বাধ্য হয়ে জাহাজ ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
বিইআরসিকে জিম্মি করে একের পর এক সুবিধা আদায় করে যাচ্ছে এলপিজি সিন্ডিকেট। আর তাতে সরকারের সায় থাকায় আত্মসমর্পণ করে যাচ্ছে বিইআরসি। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো এলপিজির দর ঘোষণার দিনেই লোয়াবের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলেন। তারা দাব করে কমিশন বেশি হওয়া উচিত ছিল। ঘোষিত দরে তাদের ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব না। আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব সভাপতি আজম জে চৌধুরী।
এক পর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও ব্যবসায়ীদের সুরেই কথা বলতে থাকেন। বিইআরসি অনেকটা বাধ্য হয়েই (৫ মাসের মাথায় ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১) ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমিশন ৩৫৯.৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪১ টাকা করে। আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় হলেও এলপিজি সিন্ডিকেটের দাপট কোন অংশে কমেনি। ক্ষেত্র বিশেষে তারা এখন আরও বেশি শক্তিশালী।
সংকটকে পুঁজি করে একের পর এক সুবিধা দেওয়া হয় আমদানিকারকদের। আমদানিসীমা বাড়িয়ে দেওয়া, ট্যাক্স কমানো এবং এলসিতে ঋণ সুবিধার ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি মাসেও জাহাজ ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু এসব সুবিধা নয়, আমদানিকারকদের দাবির প্রেক্ষিতে ঋণে এলসি খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫টি কোম্পানি তাদের আমদানির ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। এত কিছুর পরও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এলপি গ্যাসের দাম। প্রকাশ্যে বেশি দামে বিক্রি করা হলেও ভোক্তা অধিদপ্তর হাতগুটিয়ে বসে রয়েছে।