superadmin
প্রকাশ : Sep 16, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ছয় মাসে পোলাওয়ের চালের দাম দ্বিগুণ ॥ রপ্তানি, মজুত ও সরবরাহ সঙ্কট নিয়ে প্রশ্ন !!!

রাজশাহী ব্যুরো : উৎসব কিংবা অতিথি আপ্যায়নে বাঙালির ঘরে পোলাও-বিরিয়ানি যেন এক অবিচ্ছেদ্য আয়োজন। কিন্তু সেই আয়োজনের অন্যতম উপকরণ সুগন্ধি চাল এখন অনেক পরিবারের বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাজশাহীর বাজারে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে চিনিগুঁড়া, কালিজিরা ও কাটারিভোগসহ বিভিন্ন সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় মাসের ব্যবধানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জীবনে সুগন্ধি চালের দাম এত দ্রুত বাড়তে দেখেননি তারা।
অন্যদিকে কৃষকদের দাবি, উৎপাদন মৌসুমে যে দামে তারা ধান বিক্রি করেছিলেন, বর্তমানে সেই ধানের দাম প্রায় দ্বিগুণ। অথচ কৃষকের ঘরে এখন আর ধান নেই। ফলে উৎপাদনকারী কৃষক বাড়তি দামের সুবিধা না পেলেও ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে চড়া দামে।
রাজশাহীর সাহেববাজার ও উপশহর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা ও প্যাকেটজাত-দুই ধরনের সুগন্ধি চালের দামই ঊর্ধ্বমুখী। কয়েক মাস আগে খোলা চিনিগুঁড়া চাল প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল ১৩৫-১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশি কালিজিরা চালের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগে ১২০-১২৫ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এখন দাম উঠেছে প্রায় ১৫০ টাকায়। দিনাজপুরের কাটারিভোগ চালের দামও কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারে। আগে মাসে একবার কিংবা বিশেষ কোনো দিনে পোলাও রান্না হলেও এখন অনেক পরিবার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সাধারণ চাল ব্যবহার করছেন।
চাকরিজীবী আজাদ বলেন, “পোলাওয়ের চাল প্রতিদিনের খাবার নয়। কিন্তু দাম এত বেড়েছে যে পারিবারিক অনুষ্ঠানেও বেশি পরিমাণে কিনতে ভয় লাগে। এত দ্রুত দাম বাড়ার কারণটাই আমাদের কাছে প্রশ্ন”।
সাহেববাজারে চাল কিনতে আসা গৃহিণী সেলিনা পারভীন বলেন, “সামনে মেয়ের জন্মদিন। আত্মীয়স্বজন আসবেন, পোলাও রান্না করতেই হবে। কিন্তু খোলা চিনিগুঁড়া চালের দামও এখন ১৪৫ টাকা। আগে যে টাকায় চার কেজি চাল কিনতাম, এখন সেই টাকায় তিন কেজিও পাওয়া যাচ্ছে না।”
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু দোকান পর্যায়ে দাম বাড়ছে-বিষয়টি এমন নয়। মূল চাপ তৈরি হয়েছে পাইকারি বাজারে। সেখানে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এরপর পরিবহন, শ্রমিক, দোকান পরিচালনা ও ব্যবসায়িক খরচ যোগ হয়ে খুচরা বাজারে দাম আরও বাড়ছে।
এক চাল বিক্রেতা বলেন, “আগে যে দামে চাল আনতাম, এখন সেই দামে কিনতে পারছি না। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।”
চাল ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন বলেন, “দাম বাড়ায় ক্রেতা কমেছে। আগে অনেকে একবারে ৫ থেকে ১০ কেজি সুগন্ধি চাল কিনতেন। এখন একই ক্রেতা এক থেকে দুই কেজি করে কিনছেন”।
সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে বিদেশে রপ্তানিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অনেকে। তাদের ধারণা, স্থানীয় বাজার থেকে চালের একটি অংশ রপ্তানিতে চলে যাওয়ায় সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করেছে। প্রধানত ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান থেকে সুগন্ধি চাল উৎপাদন করা হয়। তবে শুধু রপ্তানিই বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ না; বাজারে ধানের সরবরাহ, মিল পর্যায়ে মজুত, উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ-সবকিছুরই প্রভাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সুগন্ধি ধানের ফলন প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বর্তমান সরবরাহে।
অন্যদিকে মৌসুমের শুরুতেই বড় চাল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দামে ধান কিনে মজুত করায় স্থানীয় ছোট মিল ও খোলা বাজারে ধানের সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি।
সুগন্ধি চাল সাধারণ চালের তুলনায় বেশি প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্য দিয়ে বাজারে আসে। ধান শুকানো, সংরক্ষণ, মিলিং, পলিশিং, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনে ব্যয় হয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় চালের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ খরচও বেড়েছে।
বাজারে চালের দাম বাড়লেও কৃষকের ঘরে এখন ধান নেই-এটাই বর্তমান বাজার ব্যবস্থার বড় প্রশ্ন। উৎপাদন মৌসুমে কৃষক যে দামে ধান বিক্রি করেছেন, পরবর্তী সময়ে সেই ধানের দাম বাড়লেও তার সুফল পাচ্ছেন না উৎপাদকরা। অন্যদিকে ধান থেকে চাল হয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে দাম বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-ধানের দাম বাড়লে কৃষক লাভবান হচ্ছেন কি না, আর চালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হচ্ছে?
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুগন্ধি চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন থেকে শুরু করে ধান সংগ্রহ, মজুত, মিলিং, রপ্তানি ও খুচরা বিক্রি-প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন। একইসঙ্গে অস্বাভাবিক মজুত, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
বাঙালির উৎসব-আনন্দ ও অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সুগন্ধি চালের দাম যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে পোলাও-বিরিয়ানিও ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ভোক্তাদের।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের পাতা মাইন শনাক্ত করতে পারছে না ইরান:

1

'আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে': ভাইরাল তাজু ভাইয়ের আড়

2

লালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফাইনাল ফুটবল ও পুরস্কার ব

3

ঝিনাইদহে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু

4

ভোক্তা অধিকার দু’টি প্রতিষ্ঠানে জরিমানা করেছে

5

অকটেনের গাড়ি কি পেট্রলে চালানো যায়? ভুল জ্বালানি ব্যবহারে ইঞ

6

অতীত অভিজ্ঞতার কারণে সংস্কার নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে

7

বাসন থানা পুলিশ কর্তৃক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে নিম্নলিখিত

8

নীলফামারীর ৪ আসনে জাপাসহ ৯ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল | নির্

9

দেশের মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন

10

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২৮ লাখ টাকার চোরাই মোবাইলসহ আটক ৩

11

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ২৪ লাখ ডলারের চি

12

সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

13

একটি নতুন অর্থনীতির বীজ: মাটি থেকে শহরের টেবিল পর্যন্ত ফলজের

14

পাবনায় আগাম জাতের শিমে কৃষকের মুখে হাসি

15

সোনারগাঁয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে বিএনপির কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা

16

ফরিদপুরে পদ্মা নদী থেকে অজ্ঞাত নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

17

ফুলবাড়ীতে যৌন উত্তেজক সিরাপ জব্দ

18

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ ক্যাটাগরির পদে চাকরি, আবেদন সময় ব

19

কিশোরগঞ্জে পৃথক ঘটনায় দু’জন খুন

20
ফটোকার্ড বানাতে ক্লিক করুন