
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীন থেকে আমদানি করা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে উন্নত প্রযুক্তির মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির চেষ্টা করছে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এ ধরনের মিসাইল তৈরি করতে পারলে সৌদি আরব ও ইসরাইলের পুরো ভূখন্ড তাদের হামলার আওতায় আসবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্রের ব্যবহার ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের শক্তিশালী নির্ভুল নিশানাভেদী ব্যালিস্টিক মিসাইল ‘খাইবার শেকান’-এর আদলে অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ চীনের একটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে হুথিরা। প্রস্তাবিত মিসাইলটির পাল্লা প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল বা ১ হাজার ৯৩০ কিলোমিটার হতে পারে।
গত বছর দুটি চালান আটক করার পর ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের জুলাইয়ে সিএআরকে কিছু তথ্য দেয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য পণ্যের আড়ালে মিসাইল তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাচার করা হচ্ছিল।
আটক করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল মিসাইলের মোটর ও কাঠামো তৈরির বিশেষ ধাতব যন্ত্রাংশ, উড্ডয়নের সময় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ব্যবহৃত ফিন এবং ইরানের ‘খাইবার শেকান’ সিরিজের কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট মোটরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান। এছাড়া মিসাইল পরীক্ষার সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও উচ্চ তাপ থেকে সংবেদনশীল অংশগুলোকে রক্ষা করার উপযোগী বিশেষ উপাদানও জব্দ করা হয়।
সিএআরকে দেখানো চালানের নথি অনুযায়ী, এসব যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে চীনের একটি নির্ভুল ধাতব যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বিশেষায়িত মহাকাশযান ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ নির্মাতা হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে প্রতিবেদনে কোম্পানিটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আমদানি করা কিছু যন্ত্রাংশ বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে বেশ কিছু উপাদান বিশেষভাবে মিসাইল তৈরির জন্যই তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালে তেহরানে প্রথম প্রকাশ্যে আনা হয় ইরানের ‘খাইবার শেকান’ মিসাইল। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি এই মিসাইল উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে প্রচলিত ব্যালিস্টিক মিসাইলের তুলনায় একে প্রতিহত করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কঠিন হতে পারে।
জাতিসংঘের ইয়েমেন নিষেধাজ্ঞা প্যানেলের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি থম্পসন বলেন, অন্তত গত দুই বছর ধরে হুথিরা চীন থেকে কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক মিসাইলের যন্ত্রাংশ আমদানি করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
তার মতে, মাঝারি পাল্লার এসব মিসাইল দিয়ে ক্রুজ মিসাইল বা ড্রোনের তুলনায় বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করে সৌদি আরবের আরও গভীরে আঘাত হানতে পারবে হুথিরা।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের অস্ত্র কর্মসূচিতে বিদেশি সরবরাহকারীদের একটি বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছে। আটক করা হুথি-সংশ্লিষ্ট পণ্যের অন্যতম প্রধান উৎস চীনা কোম্পানিগুলো। গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ড্রোনের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের বেশির ভাগই চীনে অবস্থিত।
গত কয়েক বছরে চীনসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছে হুথিরা। গত বছর লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলায় সহায়তার অভিযোগে একটি চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বেইজিংয়ের দাবি, ইয়েমেনের এই গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলে। বেসামরিক ও সামরিক- দুই ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জটিল। হুথিদের আমদানি করা কিছু যন্ত্রাংশ উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা গেলেও অন্য কিছু উপাদান সরাসরি অস্ত্র ব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য তৈরি।
হুথিদের বিদেশ থেকে বিশেষায়িত মিসাইলের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিএআর-এর বিশেষজ্ঞরা তুলনামূলক কম পাল্লার ‘সদর’ মিসাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই ধরনের বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রাংশ আমদানির নথি শনাক্ত করেছিলেন। তবে ওই যন্ত্রাংশের সরবরাহকারী কে ছিল, তা জানা যায়নি।
সাম্প্রতিক এই অনুসন্ধান থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, হুথিদের অস্ত্র সংগ্রহের প্রচেষ্টা এখন আরও উন্নত মিসাইল ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ সংগ্রহের পর্যায়ে পৌঁছেছে।